Tuesday, October 4, 2022
spot_imgspot_img

বাংলাদেশে ডলারের ব্যাবহার কিভাবে হচ্ছে ও কেন দিন দিন বাড়ছে

পৃথিবীতে যত আন্তর্জাতিক লেনদেন হয় তার বেশিরভাগই হয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মুদ্রা ডলারের মাধ্যমে। এছাড়া দেশগুলো যে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ রাখে তার বড় অংশ রাখা হয় ডলার হিসেবে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল আইএমএফের 2019-20 এর হিসাব অনুযায়ী বিশ্বের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের 60% রাখা হয় ডলারে। বৈদেশিক মূদ্রার বিনিময় ফরেন এক্সচেঞ্জ মার্কেট এর যত মুদ্রা বেচাকেনা করা হয়। তার 90% ডলার ঋণের 40% ইস্যু করা হয় ডলারে। আন্তর্জাতিক বিনিময়ের মাধ্যম হিসেবে ডলারের আধিপত্যই এর কারণ বলে মনে করা হয়। ডলারের ব্যবহারে বাংলাদেশ ও অন্যান্য দেশ থেকে ব্যতিক্রম নয়। তাহলে জেনে নেয়া যাক বাংলাদেশে কোন কোন খাতে ডলারের ব্যবহার সবচেয়ে বেশি হয়।

আমদানি-রপ্তানিঃ

ব্যাপকভিত্তিক আমদানির ওপর নির্ভরশীল একটি দেশ বাংলাদেশ। তেলের মত নিত্যপ্রয়োজনীয় নানা পণ্য ছাড়াও বিভিন্ন রকমের জিনিসপত্র আমদানি করে দেশটি। এছাড়া বাংলাদেশে যেসব পণ্য রপ্তানি করে, তার কাঁচামাল আর যন্ত্রপাতির আমদানি করতে হয় বিদেশ থেকে। আমদানি খরচ মেটাতে মোটা অংকের বৈদেশিক মুদ্রা তথা ডলার খরচ হয়। কারণ আমদানি পণ্যের বিনিময় মুদ্রার সিংহভাগ এই মুহূর্তে 4100 কোটি ডলারের বেশি রিজার্ভ রয়েছে বাংলাদেশের। তবে অর্থনীতিবিদরা বলছেন গত নয় মাসে আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে 57%, ফলে এখন বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ রয়েছে তা দিয়ে পাঁচ মাসের আমদানি ব্যয় মেটানো সম্ভব। বাংলাদেশে যত ডলারের পণ্য রপ্তানি করে তার চেয়ে বেশি ডলার খরচ করে পণ্য আমদানি করতে।

ফলে আমদানি-রপ্তানির হিসাবে ঘাটতি থাকে সবসময়। সহজ কথায় বলা যায়, বাংলাদেশে একটি বাণিজ্য ঘাটতির দেশ। আন্তর্জাতিকভাবে যেসব সংস্থা প্রতিষ্ঠান কিংবা সরকারের কাছ থেকে বাংলাদেশে ঋণ গ্রহণ করে তার সুদ আসল দেশটিকে পরিশোধ করতে হয়। বিদেশী মুদ্রা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ডলারের মাধ্যমে এই ঋণ বাংলাদেশ সরকারি ব্যবস্থাপনায় করে থাকে। এর অংশ হিসেবে প্রতি বছর বাজেটে বিপুল পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ রাখা হয়। বাংলাদেশে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো বিদেশি মুদ্রায় ঋণ দেয়। মূলত ঋণ নিয়ে থাকে বিভিন্ন বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য। প্রায় সব ক্ষেত্রেই এই ঋণ দেয়া হয় ডলারের মাধ্যমে। অনেক সময় কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে ডলার কিনে নেয়। আবার বাজারে ডলারের চাহিদা বেড়ে গেলে, কেন্দ্রীয় ব্যাংক আবার বাজারে ডলার বিক্রি করে। যাতে ডলারের দাম খুব বেশি না বাড়ে। ডলারের দাম বেশি বেড়ে গেলে আমদানিতে অতিরিক্ত খরচ করতে হয়। তবে যেসব প্রতিষ্ঠান ডলারের মাধ্যমে ঋণ দেয়া হয় তারা সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোকেও ডলারের মাধ্যমে ঋণ পরিশোধ করে থাকে।

বিদেশে ভ্রমণঃ

আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য এবং সহজ হওয়ার কারণে পর্যটন বা বিদেশ ভ্রমণের ক্ষেত্রে ডলারের ব্যাপক ব্যবহার রয়েছে। বিদেশ ভ্রমণের ক্ষেত্রে একজন ব্যক্তি বছরে সর্বোচ্চ পাঁচ হাজার ডলার পর্যন্ত ক্যাশ সঙ্গে নিতে পারেন। সেক্ষেত্রে এই অর্থ তাকে অবশ্যই পাসপোর্টে এনডোর্স করতে হবে। বিদেশ ভ্রমণের সময় ডলার নেয়ার কয়েকটি আইনি পদ্ধতি রয়েছে। যার মধ্যে একটি হচ্ছে গ্যাস বা নগদ অর্থ সাথে করে বহন করে নিয়ে যাওয়া, আরেকটি হচ্ছে ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে পাসপোর্টে ডলার এনডোর্স করতে হয়। এছাড়া ট্রাভেলার্স চেকের মাধ্যমে একজন ভ্রমণকারী বিদেশের ডলার সঙ্গে করে নিয়ে যেতে পারেন, যা তিনি আবার নগদে পরিণত করতে পারেন।

উদাহরণ হিসেবে ধরা যায় – একজন বাংলাদেশ ব্যক্তিগত ভ্রমণের ক্ষেত্রে একটি পঞ্জিকাবর্ষ বা ক্যালেন্ডার ইয়ার অর্থাৎ জানুয়ারির 1 তারিখ থেকে ডিসেম্বর মাসের 31 তারিখ পর্যন্ত সর্বোচ্চ 12 হাজার পর্যন্ত ডলার এনডোর্স করতে পারবেন। এর মধ্যে একবার ভ্রমণের সর্বোচ্চ পাঁচ হাজার ডলার নগদ নিতে পারবেন। বাকি অর্থ ক্রেডিট কার্ড কিংবা অন্য বিনিময়যোগ্য মুদ্রা যেমন পাউন্ড, ইউরো কিংবা ইউয়ানের রূপান্তর করে সঙ্গে নিতে পারবেন। ভ্রমণের জন্য ডলার ব্যাংক কিংবা মানি চেঞ্জার এর কাছ থেকে ডলার কিনে তা পাসপোর্টে এনডোর্স করে নিতে হয়। বাংলাদেশের বেশিরভাগ বিদেশ ভ্রমন কারী প্রায় ক্ষেত্রেই নগদ অর্থ সাথে করে নিয়ে যান। তবে অনেক ভ্রমণকারী আবার ব্যাংক কিংবা মানি চেঞ্জার এর কাছে না গিয়ে কার্ব মার্কেট বা অনুমোদিত নয় এমন বাজারব্যবস্থা থেকে ডলার কেনে। তবে এ ক্ষেত্রে ব্যাংকের চেয়ে ডলারের দাম বেশি হয়ে থাকে।

অনলাইন কেনাকাটাঃ

ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করে বিদেশ থেকে অনলাইনে কেনাকাটার ক্ষেত্রে ডলার ব্যবহার করা যায়। তবে এমন কেনাকাটায় একবারে 300 ডলারের বেশি ব্যয় করা সম্ভব হয় না। তবে অনলাইন ব্যবহার না করে, যদি কেউ বিদেশে ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে সরাসরি পণ্য বা সেবার জন্য পেমেন্ট করেন তাহলে ক্রেডিট কার্ডের এমন কেনাকাটায় এর চেয়ে বেশি ব্যয় করা সম্ভব হবে।

শিক্ষাঃ

বাংলাদেশের ডলার ব্যবহারের আরেকটি খাত হচ্ছে শিক্ষা। বিদেশে পড়াশোনা করতে যাওয়া শিক্ষার্থীদের খরচ হিসেবে এই অর্থ বাংলাদেশ থেকে বাইরের দেশে পাঠানো হয়। এই অর্থ পাঠানোর চ্যানেল হিসেবে বিভিন্ন ব্যাংকে ব্যবহার করে পড়াশোনার হিসেবে অর্থ পাঠানো হয়। সেটি একজন ব্যক্তির এক ক্যালেন্ডার ইয়ারে সর্বোচ্চ 12 হাজার ডলার নেয়ার শর্ত রয়েছে তার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত নয়। তবে এই অর্থ দিতে হলে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন এর ভিত্তিতে বিশেষ একটি একাউন্টের মাধ্যমে পাঠাতে হবে। ব্যাংকাররা জানাচ্ছেন প্রায় সব ব্যাংকে বিদেশ অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীদের জন্য ডলারের শিক্ষা খরচ পাঠানোর সুযোগ দিয়ে থাকে। এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকে একটি শিক্ষার্থী ফাইল বা স্টুডেন্ট ফাইল খুলতে হয় সেখানে পড়াশোনায় সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান সম্পর্কিত প্রয়োজনীয় তথ্য শিক্ষার্থীর তথ্য থাকে।

চিকিৎসাঃ

ডলার ব্যবহারের আরেকটি খাত হচ্ছে বিদেশে চিকিৎসা। প্রতিবেশী দেশ ভারত সহ বিশ্বের অনেক দেশেই চিকিৎসা নিতে যান বাংলাদেশীরা। সেক্ষেত্রে ডলার সেবা মূল্য পরিশোধের জন্য ব্যবহার করা হয়ে থাকে। সাধারণভাবে একজন ব্যক্তি বছরে 12000 ডলার পর্যন্ত বিদেশে খরচের জন্য বহন করতে পারেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন সাপেক্ষে চিকিৎসার খরচের জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি এক বছরে আরো 10 হাজার ডলার পর্যন্ত বহন করতে পারবেন। এরকমের আরও আর্টীকেল পড়তে এবং জানতে চাইলে আমাদের সাথেই থাকুন।

Related Articles

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

আমাদের ফলো করুন

2,258FansLike
1,069FollowersFollow
1,569FollowersFollow
- Advertisement -spot_img

আরোও পড়ুন